‎সিলেটে একদিন, ১২ জনের প্রাণহানী

সারাদেশ সিলেট
শেয়ার করুন

‎নিজস্ব প্রতিবদক :: একদিনেই যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল সিলেট বিভাগ। সিলেটের বিভিন্ন স্থানে পৃথক ঘটনায় প্রায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু, গৃহকর্মী কিশোরীর মৃত্যু, বজ্রপাতে কর্মব্যস্ত দুইজনের মৃত্যু, ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে নিহত হলেন এক র‌্যাব সদস্য, আর হামের থাবায় নিভে গেল পাঁচ শিশুর প্রাণ। এরই মধ্যে মায়ের হাতে শিশুকন্যা হত্যার হৃদয়বিদারক ঘটনায় স্তব্ধ পুরো সিলেট।

‎শুক্রবার (২২ মে) দিনভর ঘটে যাওয়া এসব পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। যা পুরো সিলেটজুড়ে শোক, আতঙ্ক ও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

‎সর্বশেষ বেলা ২টার দিকে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের শিকারখাঁ গ্রামের রাহুর খালে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত মুন্না (৭) ও রাফা (৬) সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাড়ির পাশের খালের ধারে খেলছিল দুই শিশু। একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত তারা পানিতে পড়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজির পর খাল থেকে তাদের উদ্ধার করে সিলেট নগরীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুই শিশুকেই মৃত ঘোষণা করেন।

একই পরিবারের দুই শিশুর এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জৈন্তাপুর থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, এ ঘটনায় থানায় এখনো কেউ লিখিতভাবে অবগত করেনি।


শুক্রবার দিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মৌলভীবাজার শহরের মুসলিম কোয়ার্টার এলাকায় একটি বাসার ছাদ থেকে পড়ে হালিমা বেগম (১৪) নামে এক কিশোরী গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।

নিহত হালিমা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল গ্রামের আক্কাস আলীর মেয়ে। তার বাবা সিলেটে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে হালিমা মৌলভীবাজার শহরের মুসলিম কোয়ার্টার এলাকার আমিনুল ইসলামের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পুলিশ জানায়, হালিমা বাসার ছাদে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন হালিমা। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে মৌলভীবাজার থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

‎মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কিশোরী গৃহকর্মীর মৃত্যু ঘটনা শুনে থানাপুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‎এর আগে, মৌলভীবাজারের রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২২ মে) সকাল ১১ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

‎নিহতদের মধ্যে রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের ভোলানগর গ্রামের কৃষক তালেব মিয়া (৪০) ধান কাটার কাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানের বেমারি টিলায় রাবার বাগানে কাজ করার সময় বজ্রপাতে নিহত হন স্বপন মুন্ডা।

স্থানীয়রা জানান, বজ্রপাতের সময় হঠাৎ বিকট শব্দে দুই এলাকাতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্বজনরা ছুটে এসে তাদের নিথর দেহ দেখতে পান। রাজনগর থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া ও কমলগঞ্জ থানার এসআই আমির আলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

‎একই দিন দুপুর ১২টার দিকে সিলেট নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন ক্বিনব্রিজ এলাকায় ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে র‌্যাব-৯ এর সদস্য ইমন আচার্য্য নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানায়, ছিনতাইকারীকে ধাওয়া করছিল কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য্য ছিনতাইকারীকে ধরতে এগিয়ে যান। ধাওয়া শেষে ছিনতাইকারীকে ধরে ফেলতেই সে ধারালো ছুরি দিয়ে ইমনের বুকের বাম পাশে আঘাত করে পালানোর চেষ্টা করে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে অভিযান চালিয়ে হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) সাইফুল ইসলাম জানান, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে ছিনতাইকারীকে আটকাতে গিয়ে প্রাণ হারান র‌্যাব সদস্য ইমন।

‎এদিকে হামে সিলেটে একদিনে সর্বোচ্চ ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে বিভাগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে। শুক্রবার সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে সুনামগঞ্জের তিনজন, হবিগঞ্জের একজন এবং সিলেটের একজন রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ২৮৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

‎গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৭৪ জন রোগী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

‎একই দিন ভোর ৫টার দিকে সিলেট সদর উপজেলার কালারুকা গ্রামে নিজের শিশুকন্যাকে গলাকেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই সময় ওই শিশু হত্যার অভিযোগে তার মাকে গ্রেফতার করে জালালাবাদ থানা পুলিশ। নিহত ওই শিশু মাইমুনা জান্নাত তোহা, তার বয়স এক বছর আট মাস বলে জানাগেছে।

পুলিশ জানায়, শিশুটির বাবা আমীর আলী ফজরের নামাজ আদায় করতে মসজিদে গেলে ঘরে থাকা অবস্থায় মা সুবিনা বেগম বটি দিয়ে শিশুর গলা কেটে হত্যা করেন। পরে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশকে খবর দেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ শিশুটির মা সুবিনা বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল বাসিত।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *