এএইচএম ফিরোজ আলী :: হজ্ব ফরজ ইবাদত এবং ওমরাহ পালন সুন্নাতে মোয়াক্কাদাহ। হজ্ব ও ওমরাহ পালনের আহকাম বা শর্তাবলী প্রায় সমান। ওমরাহ, হজ্বের মত একটি সম্মাণীত ও মর্যাদাবান ইবাদত। পবিত্র কুরআন শরীফে হজ্ব ও ওমরাহ পালনের জন্য তাগিদ দিয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে। হজ্ব ও উমরার গুরুত্ব তাৎপর্য সর্ম্পকে হযরত মুহাম্মদ (সা:) বর্ণনা করেছেন, ‘রমজান মাসে ওমরাহ হজ্ব পালন করা এক হজ্বের সমান সাওয়াব (বোখারি ও মুসলিম)। মুসলিম শরীফের বর্ণনায় আছে, রমজান মাসে ওমরাহ পালনকারি, নবী (সা:) এর সাথে হজ্ব পালনের সমান।
পবিত্র কাবাশরীফ পৃথিবীর সর্বপ্রথম ইবাদত খানা। আল্লাহর এ ঘর বরকতময় ও কল্যাণের আধার (প্রধান ভিত্তি)। এ ঘর বায়তুল্লাহ, নামাজের ক্বিবলাহ, মুসলিম জাহানের গর্ব ও ঐক্যের প্রতীক। পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থান এবং আকাশের বায়তুল মামুর সোঁজা নিচে কাবাঘর অবস্থিত। মহান আল্লাহ, ‘‘পবিত্র কোরানে কাবাশরীফ সম্পর্কে ঘোষনা করেছেন, ‘‘নিশ্চই মানব জাতির জন্য, সে ঘর সর্বপ্রথম নির্মাণ করা হয়েছিল এ ঘর মক্কায় অবস্থিত,। জান্নাতি একটি পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ:) কাবাঘর পূন:ণির্মাণ করেছিলেন। আজও কাবা ঘরের পাশে একটি গ্লাসের ভেতর ইব্রাহিম (আ:) পদ (পায়ের) চিহ্ন দেখা যায়। মহানবী (সা:) বলেছেন, হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়া (আ:) পৃথিবীতে আগমনের পূর্বে, আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতাগণ পবিত্র এ কাবাঘর নির্মাণ করেছিলেন। ‘মসজিদে হারাম শরীফে নামাজ পড়লে অন্য কোন মসজিদের নামাজের চেয়ে একলাখ গুন বেশি সাওয়াব।
রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন বায়তুল্লাহ শরীফের উপর ১২০টি রহমত অবর্তীণ করেন, এর মধ্যে ৬০টি তাওয়াফকারিদের জন্য, ৪০টি কাবাশরীফের নামাজ আদায়কারি এবং ২০টি দর্শনকারীদের জন্য নির্ধারিত। ইবনে খোশাইবার রেওয়াতে আছে, ‘যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করেন, সে এক কদম উঠানোর পর অপর কদম রাখার আগেই আল্লাহ তায়ালা একটি গোনাহ মাফ করে, একটি নেকি দান করেন এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
ইহরাম আরবি শব্দ, ইহার অর্থ হারাম করা। হজ্ব বা ওমরাহ পালনকারী নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করার পর তাঁর উপর হালাল ও কিছু বিষয় হারাম হয়ে যায়। পুরুষ সাদা দুই টুকরো কাপড় (সেলাই বিহীন), মহিলারা সেলাইযুক্ত কাপড় দিয়ে এহরাম বাঁধতে হয়। এহরাম বাধার পর মোমিন অনুভব করেন, একদিন এভাবে সাদা কাপড় পড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিয়তের পর তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে ইহরাম বাঁধার পর অনেক কাজ নিষেধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে এহরাম বেধে মক্কায় যাওয়া যায়। ওমরাহ হজ্বের প্রধান ফরজ দুইটি। রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘যখন কোন মুসলমান হজ্ব বা ওমরাহ পালনে জন্য তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ডান ও বাম দিকে পৃথিবীর শেষ সীমান্ত পর্যন্ত যত পাথর, বৃক্ষ ও মাটির চাকা রয়েছে, সব কিছুই তালবিয়া পাঠ করে। রাসুল (সা:) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি বায়তুল্লার ভেতরে প্রবেশ করবে সে যেন নেকিতে প্রবেশ করলে এবং গুনাহ থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হয়ে বের হবে,। কাবাশরীফের ভেতর প্রবেশ করা খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। হজ্ব বা ওমরাহ পালণকারীগণ ‘বাবুস সালাম, দরজা দিয়ে কাবাশরীফে প্রবেশ করা উত্তম।
ওমরাহ পালনের নিয়মকানুন সর্ম্পকে অনেকের জানা নেই, সহি শুদ্ধ ও নিখুঁতভাবে কোরান হাদিসের আলোকে অনেক বাংলা বইপুস্তক কিংবা দক্ষ আলেমের নিকট জানা আবশ্যক। এতে সাওয়াব অনেক বেশি। তাওয়াফ করার প্রধান শর্ত ৩টি। ১ মুসলমান হওয়া ২ নিয়ত করা ৩ কাবাশরীফের ভেতর তাওয়াফ করা। তাওয়াফের ফরজ হচ্ছে, সাত চক্কর পূরণ করা, নিজে তাওয়াফ করা, হেরাম শরীফের ভেতর তাওয়াফ করা। কাবাশরীফের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে, কাবাশরীফের গিলাফ, রোকনে ইরাকি, রোকনে ইয়ামনি, রোকনে সামি (সিরিয়া), রোকনে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহিম, মুনতাজাম, হাতিম (হাজরে ইসমাইল), সাখরাওযান (উৎসব মুখ), মিমারে রহমত (ছাদের বৃষ্টির পানি পড়ার স্থান), কাবাশরীফের দরজা ও হাজরে আসওয়াদ। এসব স্থানে দোয়া কবুল হয়। তাওয়াফের মাকরুহ কাজসমুহ, অযু ছাড়া তাওয়াফ করা, খুৎবা বা জামাতের সময় তাওয়াফ করা, প্রস্রাব-পায়খানার চাপ নিয়ে তাওয়াফ করা, তাড়াহুড়া, রাগ, ক্ষুধা, উত্তেজিত হয়ে তাওয়াফ করা, তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ না পড়া, এক চক্কর পর অন্য চক্করে বিলম্ব করা, হাজরে আসওয়াদে চুমা, বা ইশারা না দেয়া। তাওয়াফের নিষেধ সমুহ হচ্ছে, অপবিত্র অবস্থা, মহিলাদের ঋতুশ্রাবের সময়, অযু ছাড়া তাওয়াফ করা, হাতিমকে তামিল না করে তাওয়াফ করা, তাওয়াফের কোন চক্কর বাদ দেয়া, তাওয়াফের ফরজ বা ওয়াজিব বাদ দেয়া, তাওয়াফের সীমা রেখা ছাড়া অন্য কোন স্থান থেকে তাওয়াফ শুরু করা।
ইহরাম থাকাবস্থায়, দুনিয়াবি চিনতা, আতর, তেল, সুগন্ধি, সাবান ব্যবহার, চুল, নখ কাটা, চুল দাড়ি চিরুনী দিয়ে আছড়ানো যাবে না। মশা-মাছি, পিপড়া, পোকা-মাকড়, উকুনসহ কোন প্রাণী হত্যা করা নিষেধ। তাওয়াফ শেষে জমজমের পানি পান করা বড় নিয়ামত। সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে যাওয়া সুন্নত এবং দুই পাহাড়ে সাত চক্কর দেয়া ওয়াজিব। নিয়ত করে, সাফা পাহাড় থেকে চক্কর শুরু করে ৭শ মিটার দুরে মারওয়া পাহাড়ে যেতে হয়। দুই পাহাড়ের মধ্যে ৭৫মিটারের মধ্যে সবুজ বাতির স্থান থেকে দ্রুত দৌড়াতে হয়। সাত চক্কর শেষে দোয়া করে চুল কাটা বা মাথা মুন্ড করলে ওমরাহের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।
ওমরাহের কাজ সম্পন্ন করে মক্কা থেকে মদিনায় যেতে হয়। মদীনায় যেতে এহরামের কোন প্রয়োজন পড়েনা। যারা আগে মদীনায় গমন করেন, তারা মক্কায় আগমনের সময় নির্দিষ্ট স্থানে এসে এহরাম বাধতে হয়। মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয়ে দুরুদ পাঠ করে নববী মসজিদের হযরত জিবরাইল (আ:) বা বাবুস সালাম দরজা দিয়ে আদবের সহিত ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। অযু করে (মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে) তাহিয়াতুল মসজিদ দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। সৌদিআরবের নিয়মানুযায়ী নুসুক নামে এ্যাপ থেকে মোবাইলে রিয়াজুল জান্নাতের প্রবেশের অনুমতি আগেই নিতে হয়। ফজর বা এশার নামাজের পর অনুমতি হলে ভীড় কম থাকে। নিজের মোবাইলে নিজে বা অন্যের সহযোগীতায় অনুমতি নেয়া সম্ভব। নবীজির রওয়াজায় রাসুল (সা:), হযরত আবু বক্কর সিদ্দিকী ও হযরত আলী (রা:) কবর রয়েছে। সেখানে অত্যন্ত বিনয়ের সহিত নিরবে সালাম জানাতে হয়। রওজা মোবারকে চুমা, হাত দেয়া, ধাক্কা-ধাক্কি ও কান্নাকাটি করা নিষেধ। রাসুল (সা:) এর হাদিস মতে, ‘মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামাজ আদায় করলে কাবাশরীফ ছাড়া অন্যান্য সকল মসজিদের চেয়ে এক হাজার রাকাত নামাজ আদায় করার চেয়ে বেশি নেকি হবে’। মসজিদে নববীতে এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে ৫০ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সমান সাওয়াব এবং এক জুমার নামাজ আদায় করলে ১হাজার জুমার নামাজের সাওয়াব পাওয়া যায়। মসজিদে নববীতে লাগাতার ৪০ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে আদায় কারীর কবরের আযাব ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। মসজিদে নববীর পাশেই জান্নাতুল বাকিতে ১০হাজার সাহাবীর কবর রয়েছে। সেখানে জিয়ারত করে মক্কা-মদীনা তায়েফসহ ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল দর্শনীয় স্থান দেখা অনেক নিয়ামত।
হজ্ব বা ওমরাহ পালনে শাররীক মানসিক আর্থিক সামর্থবানরা নিয়ত করে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। সৎ পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ওমরাহ পালন করলে মহান আল্লাহ কবুল করেন। প্রতি রমজান মাসে মুসলিম বিশ্ব থেকে লাখ লাখ মুসলমান ওমরাহ পালনে মক্কা মদিনায় আগমন করেন। সবদেশেই আল্লাহর মেহমানদের নাম শুনলেই সে দেশের সরকার ও জনগণ সহায়তা করে থাকেন। ইতিপূর্বে তিনবার মক্কা ও মদিনায় যাওয়া আমার সৌভাগ্য হলে, অনেক বিদেশীদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা বলছেন, তাঁদের দেশের সরকার ও জনগণ হাজিদের মনে প্রাণে সহায়তা করে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ মুমিন হজ্ব বা ওমরাহ পালনে গমণ করছেন। এতে সৌদিআরব ও মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের অনেক সুনাম বৃদ্বি পাচ্ছে। কিন্তু এদেশের অনেক ট্রাভেলস নানা কৌশলে ভিসাফি, নুসুকফি, মক্কা-মদিনা হোটেলভাড়া, বিমানভাড়া, গাড়িভাড়া নামে দ্বিগুন টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। দেশের এয়ারপোটে হাজিদের হয়রানিও করা হয়। এ বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রনালয় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক।
লেখক কলামিষ্ট : এএইচ এম ফিরোজ আলী।
