এএইচএম ফিরোজ আলী ::
বিশ্বে পর্যটন এখন মহামুল্যবান সম্পদ। দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে, এ শিল্প এখন খুবই জনপ্রিয়। পর্যটন অধিকাংশ দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশ বার্বাডোজ, ত্রিনিদাস, টোবাকো, জাইকা, গ্রেনাডাসহ দ্বীপদেশগুলোর একমাত্র ভরসা পর্যটন। মালদ্বীপ, মিশর, থ্যাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলংঙ্কা, চীন, জাপান, ফ্রান্স, সিংঙ্গাপুর, থাইওয়ান, হংকংসহ সমুদ্র তীরবর্তী দেশে পর্যটন শিল্পের ব্যবসা জমজমাট। মিয়ানমার থ্যাইল্যান্ড ও ভারতের দেড় মিলিয়ন ও বাংলাদেশের ৩০মিলিয়ন লোকের জীবিকা নির্বাহে বঙ্গোপসাগরের উপর নির্ভরশীল। বিশ্বে পর্যটন খ্যাতে ৩৩০মিলিয়ন লোক কর্মরত এবং ২শ কোটি পর্যটকের প্রতি ৭জনে ১জন বিশ্ব ভ্রমন করে থাকেন। সিংঙ্গাপুর জাতীয় আয়ের ৭০ভাগ, থাইওয়ান ৬৫ভাগ, হংকং ৫৫ভাগ, ফিলিফাইন ৫০ভাগ, থ্যাইল্যান্ড ৩০ভাগ, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন, মালেশিয়া প্রায় ৪০ভাগের বেশি পর্যটন খ্যাত থেকে আয় করে। আজ ২৭সেপ্টেম্বর বিশ^ পর্যটন দিবস। পৃথীবিতে জাঁক-জমকভাবে দিবসটি পালিত হবে। দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বসম্প্রদায়ের সাথে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিকাশ দিবসটি মূল লক্ষ্য। ১৯৮১সাল খেকে দিবসটি পালন কার হচ্ছে। ১৯৯৭সালে তুরস্ক সম্মেলনে পর্যটনের গতিশীলতায় ঐক্য মত প্রতিষ্টিত হয়। বিশ্বের সেরা ব্যবসার নাম পর্যটন।
যে কোন দেশের পর্যটনে ৭টি আবশ্যকীয় উপদান থাকতে হয়। (১) সাগর বা উপসাগর, (২) নদনদী ও জলাশয়, (৩) বন-পাহাড়-পর্বত, (৪) ইতিহাস সংস্কৃতি (৫) ঋতু বৈচিত্র, (৬) জীব বৈচিত্র, (৭) আথিয়েতা। এ সবকটি উপাদান বাংলাদেশে বিদ্যমান। বাংলাদেশে প্রতিবছর দেড় কোটি পর্যটক ভ্রমণের কথা বলা হলেও গত ১দশকে এ সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুন। কিন্তু এসব পর্যটকরা দেশ ভ্রমন না করে বিদেশ পছন্দ করেন বেশি। দেশের অভ্যন্তরে ৭০০টির বেশি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্র অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে। ২০০৯-২১সাল ১৩বছর সময়ে ৩০৬.২০কোটি টাকা ব্যয়ে ২২টি, ২০২২সালে ৩৩৫কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। অনেক প্রকল্পের কাজ এখন সম্পন্ন হয়নি। দেশে পর্যটন খ্যাতে ৪০লাখের বেশি লোক কর্মরত এবং ভাসমান কয়েক লাখ ক্ষদ্র ব্যবসায়ি এ খ্যাত থেকে আয় করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পর্যটন এলাকার হোটেল রেস্টুরেন্ট ব্যবসা সরম গরম। পর্যটন এখন বাংলাদেশের মানুষের নিকট আয় রোজগারে অন্যতম হাতিয়ার।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ রুপের লীলা ভুমি বাংলাদেশ। প্রকৃতির অপার সম্ভাবনাময় বিচিত্র চেহারার সমুদ্র সৈকত, লেক, দ্বীপাঞ্চল ও সাগর নদীর মোহনা প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রতœতাতি¦ক নিদর্শন সমুহ ভ্রমন পিপাসু পর্যটকদের মায়ার বন্ধনে আকৃষ্ট করে। ৫৬হাজার বর্গমাইল বেষ্টিত রুপসী বাংলার জল পর্যটনগুলো বিনোদনের বড় মিউজিয়াম। এজন্য বলা হয়, ‘এমন দেশটি কোথাও খোজে পাবো নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি। বাংলার রুপে মুগ্ধ হয়ে কবি জীবনান্দ দাস বলেছিলেন, ‘আমি বাংলার মূখ দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রুপ খুজিতে যাই না আর,। বিদেশি পর্যটকদের নিকট বাংলার প্রকৃতি যেন বৈচিত্রময় মনোলোভা সৌন্দের্যের বিশাল খনি।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের জল পর্যটনের জনপ্রিয় ও বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এ সৈকতের অবস্থান। এ সৈকতের সুনাম বিশ^জুড়ে। কর্ণফুলি নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মিলিত হওয়ায় মনোমুগ্ধকর বিশালাকৃতির এ সৈকতে দিবানিশি পর্যটকের ভীড় লেগেই থাকে। সৈকতের পাশেই কর্ণফুলি ট্র্যানেল যেন পর্যটন কেন্দ্রটির আকর্ষন আকাশ ছোয়া। সিমেন্টের ডালাই ও বড় বড় পাথর দিয়ে সৈকতের বেড়িবাধ নির্মান করা হয়েছে। ১৯৯১সালের ঘর্ণিঝড়ে সৈকতটি মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুসংবাদ যে, পর্যটন কেন্দ্রটিকে বিশ্বমানের গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৫কিলোমিটার এলাকা আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। পতেঙ্গায় সূর্যোদয় ও সুর্যাস্তের লাবন্যময় দৃশ্য ভ্রমন পিপাসুদের মনের তৃষ্ণা মিটায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলি নদীতে পুতে থাকা মাইন ১৯৭২সালে অপনসারনের জন্য,‘সোভিয়েতের স্যালভেজ দল এসে মাইন অপসারনের সময় একজন উদ্ধার কর্মীর মৃত্যু ঘটে এবং পতেঙ্গা এলাকায় তার কবর দেয়া হয়। আজও রুশনাগরিক ও সৈন্যরা বাংলাদেশে আসলে কর্মীর কবরে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যান।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সাঁতার কাটা খুবই ঝুকিপূর্ণ হলেও পর্যটকরা সমুদ্রের গভীরে নেমে যান। অনেকে স্পিড বোর্ড দিয়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ান এবং নোঙ্গর করা বিশাল বিশাল জাহাজ দেখতে পারেন। সমুদ্র উত্তাল হলে ৪ থেকে ৫ফুট উচ্চতার ঢেউ তীরে আঘাত করে। সমুদ্রের গর্জন ও আকাশে কাল মেঘ যেন প্রকৃতিকে শীতল-ঠান্ডা করে পর্যটকদের অনুপ্রেরনা যোগায়। সৈকতের হোটেল রেস্তোরায় চিংড়ি, কাঁকড়া, সমুদ্রের মাছ ও শুটকির মজাদার খাবার পাওয়া যায়। হরেক রকম জিনিসপত্র কেনার বার্মিজ মার্কেটও রয়েছে। ভাষাগত সমস্যায় পর্যটদের নিকট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। সড়ক ও রেল পথে চট্টগ্রাম গিয়ে পর্যটন বাসে সৈকতে যাওয়া যায়।
গত ২১আগষ্ট আমি ও আমার সহধর্মীনি শিরিয়া বেগম, রিনা বেগম, বেলাল আহমদ, রুনা বেগম, নিশাত জাহান, নূজাহাত জাহান কে নিয়ে সমুদ্র সৈকতে যাই। সেদিন আকাশে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে ভিজে পর্যটন বাসে এক অজানা গন্তব্যে যাত্রা শুরু করলাম। সড়কের দুই পাশে সবুজ শ্যামল ছোট ছোট পাহাড় পর্যটকদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। প্রায় অর্ধেক রাস্তাই ফ্লাই অভারের উপর দিয়ে যেতে হয়। একদল তরুণ আকর্ষণীয় সুরে গান গেয়েছিল ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাতা,। ঘন্টা খানেক পর বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক থাকিয়ে দেখা গেল আমরা যেন সিঙ্গাপুর বা সুইজারল্যান্ডে আছি। প্রতেঙ্গা সৈকত এলাকার যেমত অবকাঠামো উন্নয়ন তেমনি অপূর্ব প্রাকৃতিক মনোরম দূশ্য। প্রচুর বৃষ্টির মাঝে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের এক মহামিলন মেলা জমেছে। সৈকতের পাশেই ১৬০মিটার গভীর ও প্রায় ৪কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সমুদ্রের তলদেশে কর্ণফুলি ট্রানেলের ভেতর দিয়ে মেট্টোবাসে একাধিক বার আসা যাওয়া করি। পতেঙ্গার ট্যুরিস্ট পুলিশ মানুষের ভীড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কর্তব্যরত এসআই হাসান জানালেন, প্রতি ঈদে লক্ষাধিক, শুক্র ও শনিবারে ১০ থেকে ১৫হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে। ১২মাসই এখানে পর্যটকদের ভীড় থাকে। পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, অনেক কান্ডজ্ঞানহীন পর্যটক সমুদ্রে শিশুদের প্রশ্রাব করায়, কলার খোসা, পলিথিন প্লাস্টিক পানিতে ফেলে দেয়। বাঁধা নিষেধ করলে পুলিশের উপর ক্ষিপ্ত হয়। এতে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। গত জুলাই মাসে একদল রুশ নাগরিক পতেঙ্গায় এসে ময়লা আবর্জনা দেখে খুবই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে গেছেন।
সেন্টমার্টিন নামে খ্যাত সম্ভাবনাময় আরেক সমুদ্র সৈকতের নাম ‘পারকি’। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩৫কিলোমিটার দক্ষিনে ১৩কিলোমিটার দৈর্ঘ এ সৈকতের অবস্থান। চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি বা বিমানবন্দর এলাকা থেকে কর্ণফুলি ট্যানেল দিয়ে পার হলেই ‘পারকি’ সমুদ্র সৈকত। ২০১৩সালে বারাসাত ইউনিয়ন পরিষদ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষনা করে। সৈকতে যাওয়ার পথে ছোট ছোট পাহাড় ও গাছ দেখা যায়। পারকি সৈকত কর্ণফুলি নদীর উপর প্রমোদতলীর আদলে নির্মিত ঝুলন্ত ব্রিজটি চোখে পড়ার মত। সমুদ্র সৈকতে নামার কোন ঘাট-সিড়ি, বসার স্থান নেই। একটি পুকুর পার থেকে কয়েক কিলোমিটার দুরে নোঙ্গর করা জাহাজ ও বিশাল ধুধু বালুচর দেখা গেল। এসময় জোয়ার আসায়, মুহুর্তেই কয়েকফুট পানি বৃদ্ধি পায়, এবং আমরা মূহুর্তেই এ স্থান ত্যাগ করি।
২০১৯সালে ১৩.৩৩একর ভূমির উপর ৭৯কোটি টাকা ব্যয়ে পারকি সমুদ্র সৈকত পর্যটন কেন্দ্রের অবকাঠামোর নির্মাণ কাজ শুরু হলে চলতি বছর আগষ্ট মাস পর্যন্ত অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি। ২০২২সালে কাজ সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কয়েকটি অর্ধেক দালানের র্নিমাণ কাজ দেখা গেল। পর্যটন উপদেষ্টা বশির উদ্দিন সরজমিনে গিয়ে দ্রæত কাজ সমাপ্তের নির্দেশ দেন।
১৯৭২সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন প্রতিষ্টায় দেশের প্রথম সংস্থাপন সচিব, মুক্তিযোদ্ধা নুরুল কাদের পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে গেছেন। ১৯৭৪সালে সমুদ্রাঞ্চল আইন, ‘ঞযব ঃবৎৎরঃড়ঃৎরধষ ধিঃবৎ ধহফ গধৎরঃরসব তড়হবং অপঃ বলবৎ থাকায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে ১লাখ ১৮হাজার ৮১৩কিলোমিটার সমৃদ্রাঞ্চল উদ্ধার করায় বিশাল সুনিল অর্থনীতির সৃযোগ সৃস্টি হয়েছে। বিশ্বের ৬০টি উপসাগরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর সবচেয়ে বড় জল পর্যটনের আর্শিবাদ। সাগরের সাথে দেশের বড় বড় নদী মিলিত হয়ে মোহনার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সময়ে পর্যটকদের নিকট জল পর্যটনের প্রতি আকর্ষন বেশি। জল পর্যটনের কারনেই বাংলাদেশকে সৌন্দের্যের লীলভূমি বলা হয়ে থাকে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও পারকি সৈকত যেন কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনের ছায়া পর্যটন কেন্দ্র।
পর্যটন সমকালীন ইতিহাসকে জীবন্ত করে। পর্যটন শিক্ষার প্রসার, জ্ঞান সম্প্রসারন এবং প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনে অপরিহার্য অঙ্গ। সমাজের অবক্ষয় রোধ, জ্ঞান আহরণ ও গবেষনায় পর্যটন এক যাদু মন্ত্র। পর্যটন স্বদেশ প্রেমের প্রেরণা শক্তি। তাই দেশ প্রেমিকরা আলোচনার মঞ্চে, বক্তৃতায় বলে থাকেন, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে, সার্থক জনম মা গো তুমায় ভালবেসে’। পতেঙ্গা ও পারকি বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তনের বিশাল সম্পদ। পতেঙ্গা ও পারকির উন্নতি, এবং পর্যটকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হলে দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে বাংলাদেশ পর্যটনের সুখ্যাতি অর্জন করবে ।
লেখক কলামিষ্ট :: এএইচএম ফিরোজ আলী।
